শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ০২:০২ অপরাহ্ন

শিরোনাম
জনগণের অধিকার বাস্তবায়নই আমাদের লক্ষ্য : ডেপুটি স্পীকার সংস্কৃতি মন্ত্রী–ইতালি রাষ্ট্রদূতের সাক্ষাৎ: সহযোগিতা জোরদারের প্রত্যয় “সংস্কৃতি হলো একটি জাতির আত্মা” : সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী বৈশাখ এলো রে এলো
সালমান রাজের কণ্ঠে, কথা ও সুর মিজানুর রহমান নতুন মৌলিক বৈশাখী গান
স্পীকারের সাথে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনারের সাক্ষাৎ মঠবাড়িয়ায় সংস্কৃতি চর্চার টাকা নিয়ে প্রধান শিক্ষকের নয়ছয় নবনির্বাচিত দুইজন সংসদ-সদস্যের শপথ পাঠ করান স্পীকার মঠবাড়িয়ায প্রাইভেটকারের গতিরোধ করে ব্যবসায়ীর ওপর হামলার চেষ্টা স্পীকারের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার প্রতিনিধি দলের সৌজন্য সাক্ষাৎ ডাচ-বাংলা ব্যাংক পিএলসি-র সাথে কর্মসংস্থান ব্যাংকের চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠিত
কীভাবে সংসার চলবে জেলেদের

কীভাবে সংসার চলবে জেলেদের

নিজস্ব প্রতিবেদক : জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটে মৎস্য আহরণ ও পর্যটন খাতে বড় ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। কক্সবাজার, পটুয়াখালীসহ উপকূলীয় অঞ্চলে ডিজেলের অভাবে শত শত ট্রলার সাগরে যেতে পারছে না। ফলে লাখো জেলের আয় বন্ধ হয়ে গেছে। এ ছাড়া ডিজেলের অভাবে পর্যটকবাহী যানের চলাচল কমে যাওয়ায় পর্যটন খাতেও বড় ধস নেমেছে বলে জানিয়েছেন পর্যটন সংশ্লিষ্টরা।

কক্সবাজারে মৎস্য আহরণ ও পর্যটন খাতে অচলাবস্থা

জেলে, ট্রলারমালিক ও মৎস্য ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, কক্সবাজার জেলার বেশিরভাগ পেট্রোল পাম্প তেল সংকটের অজুহাতে বন্ধ করে রেখেছে। এতে পর্যাপ্ত পরিমাণ জ্বালানি তেল না পেয়ে জেলার উপকূলীয় অঞ্চলে অবস্থানরত মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলার, আন্তসড়ক, মহাসড়কগুলোতে চলাচলরত যানবাহন থেকে শুরু করে কম বেশি সব খাতে প্রভাব পড়েছে। পর্যাপ্ত পরিমাণ তেল না পাওয়ায় অধিকাংশ মাছ ধরার ট্রলার সাগরে যেতে পারছে না।

পাশাপাশি কক্সবাজার ভ্রমণে আসা লাখো পর্যটক বহনে নিয়োজিত বিভিন্ন যানবাহনও পড়েছে জ্বালানি সংকটে। বিশেষ করে পর্যটকদের কাছে সামুদ্রিক মাছের চাহিদা থাকায় আগের মতো পর্যটকদের চাহিদা পূরণ করতে পারছেন না ব্যবসায়ীরা। একইভাবে বেকায়দায় পড়েছে সেচ পাম্পগুলোও। পেট্রোল পাম্পগুলোতে ডিজেল নেই, ফলে ধান ও সবজি চাষিরা সেচ সরবরাহ করতে হিমশিম খাচ্ছেন।

শহরের বাঁকখালী নদীর মাঝিরঘাট, ৬ নম্বর জেটিঘাট এলাকায় তেলের অভাবে শত শত ট্রলার অলস বসে আছে। নদীর উপকূলে থাকা ভাসমান পেট্রোল পাম্পের অধিকাংশই জ্বালানি শূন্য হয়ে পড়ায় বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছে। কোনও কোনও পাম্প গত কয়েকদিন ধরে পুরোপুরি বন্ধ আছে। ফলে সাগরে যেতে না পারায় লাখো জেলে পরিবারের আয় বন্ধ হয়ে গেছে। তারা অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। জেলেরা মাছ ধরতে না পারায় স্থানীয় বাজারগুলোতে মাছের সরবরাহ কমে গেছে। দামও সাধারণের নাগালের বাইরে চলে গেছে।

পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, জ্বালানি সংকটের কারণে জেলার অন্তত পাঁচ শতাধিক হোটেল-মোটেলে জেনারেটর চালানো সম্ভব হচ্ছে না। এতে পর্যটকরা ভোগান্তিতে পড়ছেন। রেস্তোরাঁগুলোতে নেই সামুদ্রিক মাছ ও পর্যটকবাহী যানগুলোতে নেই জ্বালানি। এতে করে অনেকটা দিশেহারা এই অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা।

জ্বালানি তেলের অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন শহরের খুরুশকুল এলাকার তছলিম মাঝির মালিকানাধীন এফবি মায়ের দোয়া ট্রলারের জেলে দিদারুল আলম। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা তো গরিব মানুষ। পেটের দায়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়েই সাগরে মাছ ধরতে যাই। সাগরে যাওয়া সহজ নয়, সেখানে অনেক ঝুঁকি থাকে। তবু সংসারের কথা ভেবে, স্ত্রী-সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে সাগরে যেতে হয়। কিন্তু এখন সাগরে যাওয়ার জন্য ঘাটে এসে দেখি তেল নেই। পাম্প বন্ধ। তেল না পেলে আমরা সাগরে যাবো কীভাবে? আর সাগরে যেতে না পারলে সংসারই বা চালাবো কীভাবে? শুধু আমি একা নই, আমার ওপর নির্ভর করছে বাড়ির ছয় সদস্য। যদি মাছ ধরতে না পারি, আয় না হয়, তাহলে পরিবারকে কীভাবে খাওয়াবো? এখন তেলের আশায় বসে আছি। কবে তেল পাবো, কবে সাগরে যেতে পারবো-সেটাও জানি না। চরম অনিশ্চয়তা।’

বাঁকখালী নদীর চেয়ারম্যান ঘাট এলাকায় নোঙর করা এফবি শাহ মজিদিয়া ট্রলারের মাঝি আব্দু শুক্কুর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘তেল নেওয়ার জন্য পাম্পে এসে খোঁজ নিচ্ছি। কিন্তু তারা বলে তেল আসেনি। পাম্পের লোকজনও বলছে, তেল না থাকলে তারা দেবে কোথায় থেকে। তেল ছাড়া তো সাগরে যাওয়া সম্ভব নয়। তেলের আশায় আমরা গত দুই দিন ধরে ঘাটে অপেক্ষা করছি। আমাদের ট্রলারের জন্য প্রায় দুই হাজার লিটার তেল প্রয়োজন। কিন্তু তেল না পাওয়ায় সাগরে যেতে পারছি না। আর্থিক সংকটে আছি।’

একই এলাকার জেলে মোহাম্মদ সেলিম বলেন, ‘৬ নম্বর ঘাটে নদীতে নোঙর করে রাখা ট্রলারগুলোতে প্রায় ৫০০ জেলে পরিবার বেকার বসে আছি। এই ৫০০ জেলের আয়ের ওপর অন্তত পাঁচ হাজার মানুষের খাবার চলে। কিন্তু ডিজেল সংকটের কারণে গত পাঁচ দিন ধরে আমরা ট্রলারে বসে আছি, সাগরে যেতে পারছি না। ট্রলার মালিকরাও কোনও টাকা দিতে পারছেন না। এভাবে হলে আমরা কীভাবে বাঁচবো।’

বাঁকখালী নদীর চেয়ারম্যান ঘাট এলাকার ফারিয়া ট্রেডিং পাম্পের ম্যানেজার রিয়াজ উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গত আট দিন ধরে তেলের সংকট চলছে। আমাদের পাম্পে প্রতিদিন ন্যূনতম প্রায় ৯ হাজার লিটার ডিজেলের প্রয়োজন হয়। কিন্তু বর্তমানে তেল সরবরাহ একেবারেই কমে গেছে, আসছেই না। এ কারণে যেসব মাছ ধরার ট্রলার তেল নিতে আসছে, তাদের দিতে পারছি না। সাধারণত একটি ট্রলার সাগরে যাওয়ার সময় অতিরিক্ত তেল মজুত করে নেয়। আগে যেসব ট্রলার মজুত থাকা তেল নিয়ে সাগরে গেছে, তারা হয়তো এই ট্রিপ শেষ করে ফিরতে পারবে। কিন্তু এরপর যদি তেলের সংকট না কাটে, তাহলে তাদের জন্য আবার সাগরে যাওয়া সম্ভব হবে না।’

শুধু বাঁকখালী নদীর মাঝির ঘাট নয়, উপকূলে আছে মোট ২১টি ভাসমান পেট্রোল পাম্প। পাম্পগুলোতে জ্বালানি তেলের সরবরাহের ওপর নির্ভর কয়েক হাজার মাছ ধরার ট্রলার। কিন্তু অনেক পাম্প গত সাত দিন ধরে বন্ধ। বাকিগুলোতে তেল নেই। ফলে নদীর তীরে এসে ট্রলারগুলো তেল পাচ্ছে না। এ কারণে নদীতে নোঙর করা ট্রলারের সারি দেখা যাচ্ছে। আর এসব ট্রলারে দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন হাজার হাজার জেলে।

Capture1
এ অবস্থায় দ্রুত সময়ের মধ্যে জ্বালানি তেল সংকট নিরসনে সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন জেলা ফিশিং বোট মালিক সমিতির নেতা এবং মৎস্য ব্যবসায়ীরা। তাদের দাবি, সাগরে মাছ শিকারে যেতে পারায় অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে লাখো জেলে পরিবার।

কক্সবাজার মৎস্য ব্যবসায়ী ঐক্য সমবায় সমিতি লিমিটেডের মুখপাত্র মো. আজাদুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘তেলের ভয়াবহ সংকট তৈরি হয়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন জেলেরা। কক্সবাজারে প্রায় ছয় হাজার মাছ ধরার ট্রলার রয়েছে। কিন্তু তেলের অভাবে সেগুলো সাগরে যেতে পারছে না। গত সাত দিন ধরে আমরা বিভিন্ন ঘাটের ২১টি ভাসমান পাম্পে খোঁজ নিয়েছি, কোথাও তেল পাওয়া যাচ্ছে না। তেল না থাকলে ট্রলার সাগরে পাঠানোর কোনও উপায় নেই। এ নিয়ে আমরাও দুশ্চিন্তায় আছি।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মান্নান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছে। নিবন্ধনকৃত নৌযানগুলোতে জ্বালানি তেল দেওয়া হবে। তবে অনিবন্ধিতগুলোতে সীমিত আকারে জ্বালানি দেওয়া হবে।’

একই অবস্থা দক্ষিণাঞ্চলের মাছ ধরা ট্রলারগুলোর

ডিজেলের সংকটে দক্ষিণাঞ্চলের হাজারো মাছ ধরা ট্রলার সাগরে মাছ আহরণে যেতে পারছে না। এতে বিপাকে পড়েছেন এ অঞ্চলের কয়েক লাখ জেলে, ট্রলার মালিক ও মৎস্য খাতের ব্যবসায়ীরা।

ট্রলারমালিক ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরবরাহে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়েছে। এতে বরগুনা, পাথরঘাটা, পটুয়াখালীর আলীপুর, মহিপুর, ভোলার লালমোহন, মনপুরাসহ বিভিন্ন মৎস্যবন্দর ও অবতরণকেন্দ্রে শত শত ট্রলার মৎস্য আহরণে সমুদ্রে যেতে পারছে না। এতে জেলেরা অলস সময় পার করছেন।

বরগুনা জেলা মৎস্যজীবী ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী ও জেলা মৎস্যজীবী ফিশিং ট্রলার শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক দুলাল হোসেন জানিয়েছেন, পাথরঘাটায় দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মৎস্যবন্দর ও বিএফডিসির মৎস্য অবতরণকেন্দ্র অবস্থিত। এখানে তিন শতাধিক মাছ ধরা ট্রলার ডিজেল সংকটে সাগরে যেতে পারছে না। এসব ট্রলার সাগরে যেতে না পারায় বন্দরটির ব্যবসা-বাণিজ্যে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। মৎস্যজীবী ও তাদের পরিবারের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে।

জেলা মৎস্যজীবী ট্রলার মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও মৎস্য ব্যবসায়ী মাসুম আকন বলেন, পাথরঘাটার জ্বালানি ব্যবসায়ীরা সংকট সৃষ্টি করে তেল মজুত করছেন। একই সঙ্গে গোপনে চড়া দামে তারা তেল বিক্রি করছেন। বেশিরভাগ মৎস্য ব্যবসায়ীই তাদের ট্রলার পাথরঘাটার বিভিন্ন খালে নোঙর করে রেখেছেন।

বরগুনার জেলা প্রশাসক তাছলিমা আক্তার বলেন, ‘যদি কোনও অসাধু ব্যবসায়ী জ্বালানি তেল মজুত করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করেন, তবে তাদের চিহ্নিত করে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

শুধু বরগুনা, পাথরঘাটা নয়, একই অবস্থা গোটা দক্ষিণাঞ্চলের মৎস্যবন্দরগুলোতে। পটুয়াখালীর মহিপুর, আলীপুর, ভোলার লালমোহন, মনপুরাসহ বিভিন্ন এলাকায় ডিজেল সংকটের কারণে সমুদ্রগামী ট্রলার সাগরে মাছ ধরতে নামতে পারছে না।

মহিপুরের মৎস্য ব্যবসায়ী ও ট্রলারমালিক মজনু গাজী বলেন, ‘দোকানগুলোতে পর্যাপ্ত ডিজেলের মজুত আছে। কিন্তু তারা দাম বাড়ার সুযোগ নিতে তা বিক্রি করছে না। সংকটের কথা বলে তারা সর্বোচ্চ ২০০ লিটার ডিজেল দিতে চায়। এই সামান্য জ্বালানি নিয়ে সাগরে যাওয়া অসম্ভব। কারণ কোনও কোনও ট্রলারে দুই হাজার-আড়াই হাজার লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়। এতে অনেক ট্রলার আলীপুর, মহিপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় নোঙর করে জেলেরা অলস সময় পার করছেন। জেলে, মালিক, ব্যবসায়ীদের দুর্দশায় পড়তে হয়।’

ভোলার মনপুরার ট্রলারমালিক নাসির উদ্দিনও একই অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, ‘এক সপ্তাহ ধরে ডিজেলের এমন সংকটের কথা জানাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। এতে আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়েছে।’

নিউজটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2022 shadhindiganta.com
কারিগরি সহযোগিতায়: